ওঁ
সময়ের শ্বাস
তথাগত অনুরাধা মুখোপাধ্যায়
জেলা পূর্ত বিভাগের চাকরিটা আমি ছেড়ে
দিয়েছিলাম রুমা আমার জীবন থেকে সরে যাওয়ার পর পরই। আমার এই সিদ্ধান্তে অনেকেই অবাক হয়েছিলো। স্থায়ী সরকারি চাকরি, মোটামুটি ভালো বেতন – এই বাজারে কেইই বা
ছাড়ে? বন্ধুবান্ধবরা ওদের মতো গালমন্দ করে বুঝিয়েছিলো। কিন্তু ওদের আমি কী করে বোঝাতাম যে তখন ঐ চাকরিটার প্রয়োজন আমার
বিশেষ ছিলো না। আমার মনে হতো অফিসের
সময়টা আমি ফালতু নষ্ট করছি। আমার একটাই নেশা – বই পড়ার। যে কোনো নেশার মতো এটাও একটা ভারি বদখৎ অভ্যেস। একবার লেগে গেলে এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া মুস্কিল…
বাবার রেখে যাওয়া একতলা বাড়িটার সাথে
সাথে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলাম বেশ কয়েক বুক-কেস ঠাসা দেশি-বিদেশি বই। বলা বাহুল্য, সেগুলো শেষ করে ফেলেছিলাম। এছাড়া জেলা গ্রন্থাগারেও অনেকটা সময় কাটাতাম। তাই চাকরিতে ইস্তফা দেবার পর নীরদদার বইয়ের দোকানে কর্মচারির চাকরিটা
আমার কাছে ছিলো একদম লটারি পাওয়ার মত ঘটনা।
নীরদদা আমার বাবার ছাত্র ছিলেন। অধ্যাপক ভুবনবাবুর মোটামুটি লেখাপড়া জানা ছেলে মাত্র কটা টাকার জন্য
সরস্বতী গ্রন্থালয়ে চাকরি করবে? হয়তো তাই আমাকে দোকানের ঐ সামান্য চাকরি দিতে তিনি রীতিমত আপত্তি
করেছিলেন। কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। মূলত আমার জোড়াজুড়িতেই শেষ পর্যন্ত নিমরাজী হয়েছিলেন। উনি থোড়াই জানতেন আমার আসল মতলব? আমার কাজ ছিলো সকালে দোকান খোলা, বই বিক্রির হিসেবপত্র
রাখা – ওটা আজকাল কম্প্যুটারের দৌলতে কঠিন কিছু নয় – আর রাত্রে দোকান বন্ধ করে ঘরে ফেরা। আর অবসর সময়ে বই পড়া।
আমাদের এই ছোট্ট মফস্বল শহরে দুপুরের
দিকে খদ্দের প্রায় হয়ই না। তাই ঐ অখন্ড অবসর আমার কাটতে লাগলো বই পড়ে। মাঝেমধ্যে অবিক্রীত বইপত্র শেলফ থেকে নামিয়ে ঝাড়াপোঁছা করতাম আমি। পুরোনো হয়ে যাওয়া বইয়ের গন্ধ খুব উপভোগ করতাম। সরস্বতী গ্রন্থাগার একতলা মোটামুটি ত্রিশ ফুট বাই দশ ফুটের আয়তক্ষেত্রাকার
দোকান। ভালোই বইয়ের সংগ্রহ। আমি কাজে যোগ দেবার পর স্টক আরো বাড়তে লাগলো। দেশ বিদেশের ক্যাটালগ ঘেঁটে নীরদদাকে বাধ্য করতাম নতুন নতুন বই আনাতে।
তুই আমার ব্যবসা লাটে ওঠাবি – বিরক্ত হয়ে বলতেন
নীরদদা। আমিও ছাড়ার পাত্র
নই। বইগুলো কেন স্টকে
রাখা দরকার তার স্বপক্ষে নানা যুক্তি সাজাতাম। কখনো সেগুলো গ্রাহ্য হতো, কখনো বা হতো না। দোকানের উপরে একটা কাঠের মাচান মতো ছিলো। ওটাও বইয়ের স্টোরেজ। একটা নড়বড়ে কাঠের ঘড়াঞ্চি বেয়ে উপরে উঠতে হতো।
এক বর্ষাভেজা দুপুরে ঐ মাচানের এক কোনে
আমি আবিষ্কার করলাম ‘হুইসপরস অফ টাইম’। ওটার বাংলা করলে কী
হবে? ‘সময়ের শ্বাস’ নাকি ‘সময়ের ফিসফাস’? কোনো এক বার্টি এডওয়ার্ডের
লেখা দেড়শো পাতার পেপারব্যাক। একটি নামি ব্রিটিশ প্রকাশনী থেকে সেই উনিশশো সালে প্রকাশিত। এই বইটা আমাদের ছোট্ট মফস্বলের সরস্বতী গ্রন্থালয়ে এলো কীভাবে? এই দোকানের প্রতিষ্ঠা
স্বাধীনতার পরের বছর। নীরদদার বাবা চারুচন্দ্রবাবু
খুলেছিলেন। বইটা তার অনেক আগের। অদ্ভুত এক কৌতুহল অনুভব করলাম আমি। মলাটে একটা সাদা-কালো ঘড়ির ছবি। অনেকটা লন্ডনের বিগ-বেনের মতো। পাতা উল্টালাম… হলদেটে হয়ে যাওয়া পাতা। বেশ কিছু পাতা উইয়ে কেটে ফুটো ফুটো, তবে পড়া যায়। এই বর্ষায় কোনো খদ্দের আসবে না। নীরদদা যথারীতি বাড়ি গিয়ে তার প্রাত্যহিক দিবানিদ্রা লাগিয়েছে। কেউ বিরক্ত করার নেই। নিজের অজান্তেই বইটার মধ্যে ডুবে গেলাম আমি…
মূলত সময় – কাল – ও তার অভাবনীয় শক্তি ও ক্ষমতার কথা দিয়ে
বইয়ের শুরু। সময় ব্যাপারটা যে খুব গোলমেলে, তা আমি জানি। ভূত আর ভবিষ্যতের
সন্ধিক্ষণের এই ন্যানো-সেকেন্ডের বর্তমান যে আসলে কত ক্ষণস্থায়ী সেটা অনুধাবন করে কজন? সবথেকে শক্তিশালী
এবং অপ্রতিরোধ্য এই কাল। কাউকে ছাড়ে না। সময়কে বশ করা বা সময়কে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনেক ফিকশন লেখা হয়েছে। এইচ.জি.ওয়েলস সাহেবের ‘দ্য টাইম মেশিন’-এর কথা সবাই জানে। এছাড়াও ‘দ্য টাইম ট্র্যাভেলার্স ওয়াইফ’ নামে আর একটা বইয়ের কথা মনে পড়ছে। খুঁজলে আরও পাওয়া যাবে। সময়ের দামের কথা আমাদের সুকুমার রায়ও খেলাচ্ছলে তাঁর হ-জ-ব-র-ল গদ্যে আমাদের মনে
করিয়ে দিয়েছেন কাক্কেশ্বর কুচকুচের মুখ দিয়ে। কিন্তু ‘হুইসপরস অফ টাইম’ যেন আর পাঁচটা বইয়ের থেকে স্বতন্ত্র। এই বইয়ে হদিশ দেওয়া আছে বিশেষ তিনটি ঘড়ির যেখানে বোতাম টিপে পৌঁছে
যাওয়া যায় অতীতে…
তিনটি ছোট শহরে লুকিয়ে রাখা এই তিনটি
বিশেষ ঘড়ি। একটি স্কটল্যান্ডে… একটি আফ্রিকা মহাদেশে
আর একটি ভারতে, পশ্চিমবাংলার ছোট্ট একটি শহরে…
ঠিক কোথায় লোকানো এই ঘড়িগুলো তা সরাসরি
বলেননি লেখক বার্টি এডওয়ার্ড। তার বদলে দিয়েছেন কিছু ক্লু…
যেমন পশ্চিমবাংলার ঘড়িটা নাকি উনিশশো
চোদ্দ সালে বসানো হবে… আশ্চর্য তো। উনিশশো সালে লেখা বইতে তার চোদ্দ বছর পরের ঘটনা? বার্টি ভবিষ্যতদ্রষ্টা
ছিলেন নাকি?
ধুর। আমিই বা এসব সত্যি বলে ভাবছি কেন? এটা হয়তো কোনো কাল্পনিক কাহিনী। অথচ আমার কেন ব্যাপারটা সত্যি বলে ভাবতে ভালো লাগছে…? শহরটা পোনেরোশো শতাব্দীতে
তৎকালীন পর্তুগিজ ভাইসরয় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো… পরে মুঘলরা পর্তুগিজ বিদায় করলে ওলন্দাজেরা
এসে বসতি বাধে… নদীর পারে অবস্থিত এই শহরের আদি নাম ছিলো উগুলিম…
নড়ে চড়ে বসলাম আমি… এ কোন শহরের কথা লিখেছেন
বার্টি? বর্ষাভেজা দুপুরের আমার এই ছোট্ট শহর নয়তো। সব তো দিব্য মিলে যাচ্ছে… নদী… পর্তুগিজ… ওলন্দাজ… উগুলিম – যার থেকে হুগলি কথাটা এসেছে…
ঘড়িগুলো নাকি চোখের সামনে ঘটে যাওয়া
সব অতীতের সাক্ষী… ওর বড়ো বড়ো মিনিটের কাঁটার পাশে কান দিয়ে শুনলে শোনা যায় ভূতের ফিসফাস… ওকে প্রশ্ন করলে ও
জানিয়ে দেয় ঘটে যাওয়া সব সত্য…
আমাদের ছোট্ট মফস্বলের একদম কেন্দ্রে
একটা ক্লক-টাওয়ার। ব্রিটিশ আমলে এরকম ঘড়িঘর অনেক শহরেই বসানো হয়েছিলো। তাঁর বইয়ে বার্টি সাহেব আমাদের ঘড়িঘরের ইঙ্গিত দেননি তো? আমার গা শিরশিরিয়ে
উঠলো…
ফের মাচানে চড়ে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার
পাতা ওল্টালাম আমি…
বিকেল গড়িয়ে গেছে। কিছু কিছু খদ্দের আসা শুরু হয়েছে। তাই বইটা বন্ধ করে তখনকার মতো আমি দোকানের কাজে মন দিলাম। রাতে বিছানায় শুয়ে বইটা গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম আমি… বইটা শেষ করার পরেও
ঘুম আসছিলো না… বাইরে অঝোরধারে বর্ষণের শব্দ শুনতে শুনতে সাত-পাঁচ ভাবছিলাম কতকিছু… বার্টির কথা যদি সত্যি
হয় তাহলে ঐ ঘড়িটার সময়ের সাক্ষী হওয়ার সাথে সাথে সময়ের গতিপথ পরিবর্তন করারও
ক্ষমতা আছে… টাওয়ারের উপরে একটা কুঠুরিতে রাখা আছে একটা চাবি, সেটা পাশে মেকানিকাল গিয়ারের আক্টা স্পিন্ডলে
ঢুকিয়ে অ্যান্টি-ক্লক ওয়াইজ ঘোরাতে হবে… এমনকি জায়গাটার একটা নকশাও দেওয়া আছে
বইটাতে… অবিশ্বাস্য…!
তাহলে ঘড়িটা কী পারবে তিনবছর আগে ঘটে
যাওয়া আমার জীবনের গতিপথ পালটে দিতে? অথবা জানাবে আমাকে আসল সত্যিটা? রুমার সঙ্গে আমার
আলাপ হয়েছিলো ঐ ঘড়িটার ঠিক উল্টোদিকের রেস্তোরাঁটার দোতলায়। দোকানের জানালা থেকে ঘড়িটা সরাসরি দেখতে পেতাম। আমাদের ভিতরে ঘটে যাওয়া কতো ঘটনার সাক্ষী ঐ ঘড়ি।
পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টে সামান্য
কাজ করতাম আমি। তাতেই বেশ সন্তুষ্ট
ছিলাম। আমার উচ্চাকাঙ্খার
অভাব নিয়ে সামান্য খেদ ছিলো রুমার। খেদ ছিলো আমার ঘরকুনোমির জন্যেও। রুমা বেড়াতে ভালোবাসতো, আমার ভালো লাগতো শুয়ে শুয়ে বই পড়তে। রুমা প্রায়ই বলতো – আত্মতুষ্টি নাকি স্লো পয়জনিং। আত্মতুষ্টি মানে বিকাশকে শ্বাস রোধ করে হত্যা করা। স্থবির জীবন নাকি এক অনড় প্রস্থর যেটাতে বছর বছর শেওলা জমে একদিন
নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলবে…
তা সত্ত্বেও আমি ভাবতাম রুমা খুব ভালোবাসতো
আমায়। রুমার চাপে পড়েই পাবলিক
সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় বসলাম এবং উত্তীর্ণও হলাম। কিন্তু ইন্টারভিউ দিতে দিল্লি যাবার কোনো তাগিদ অনুভব করলাম না। কম সময়ে ট্রেনের টিকিট না পাওয়ার যুক্তি খাড়া করলাম। রুমা প্লেনের টিকিট কিনে দেওয়ার প্রস্তাব দিলো। রাজী হলুম না…
আমাদের প্রেম ভাঙার নোটিসটা রুমা পাঠিয়েছিলো
চিঠির মাধ্যমে। কোনো কারণ ব্যাখা
না করেই। সেদিন থেকে কারণ খুঁজে
চলেছি আমি। কী হতে পারে? বেমানান মূল্যবোধ? স্থবিরতার অসুখ? আমার উচ্চাশার অভাব? খারাপ লেগেছিলো, কিন্তু মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু আরো খারাপ লেগেছিলো যখন আমি জানতে পেরেছিলাম যে রুমা তলে
তলে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসরের সাথে প্রেম চালাচ্ছিলো। আমি আসলে ছিলাম ওর জীবনে একটা স্টেপনি। পুরোনো তাপ্পি দেওয়া টায়ার – যেটা প্রয়োজনে, ক্বচিৎ কখনো ব্যবহার
করার সামগ্রী…
আমার অন্যান্য বন্ধুদের কাছে থেকে জানতে
পেরেছিলাম যে ঐ টকটকে গৌরবর্ণ সুপুরুষ অধ্যাপক মশাইয়ের সাথে বসে আমাদের ঘড়ির মোরের
রেস্তোরাঁতে একত্রে ফিশ্ ফ্রাই আর কফিও খেয়েছিলো। ওর আমার প্রতি অনীহার আসল কারণটা তাহলে কী? আমার ল্যাদ না ঐ অধ্যাপকমশাই?
ঐ ঘড়িটা কী বলতে পারবে আসল সত্যিটা? ও তো সবই দেখেছে… ওর সামনে ঘটে যাওয়া
সব ঘটনার সাক্ষী… ও কী ঘুরিয়ে দিতে পারবে তিন বছর আগে ঘটে যাওয়া সময়ের চাকা… ও কী নতুন কোনো যাদুমন্ত্রে
রিক্রিয়েট করতে পারবে ইন্টারভিউ দিতে আমার দিল্লি যাওয়া…? পারবে কী রুমার জীবনে ঐ অধ্যাপকের আসা
বন্ধ করতে? ঘড়িঘরের বড়ো ঘড়িটাকে একবার ভেতর থেকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলাম আমি।
ঘড়িটার রক্ষণাবেক্ষণ শহরের পি.ডবলু.ডি-র দায়িত্বে। সন্তোষ – ঐ যে ছেলেটা প্রতি শুক্কুরবার ঘড়িটার ফাঁপা টাওয়ারের ভিতরের সিঁড়ি
চড়ে ভিতরে হ্যান্ডল ঘুরিয়ে ওটাতে দম দেয় – তাকে আমি চিনি। কাল শুক্রবার। এই অঞ্চলে শুক্রবার দোকান বন্ধ থাকে। দুপুরবেলায় একফাঁকে সন্তোষের সাথে ক্লক টাওয়ারটাতে ঢুকবো নাকি? শুনবো নাকি ঘড়িটার
ফিস-ফাস…?
ভাবনাগুলো মাথার মধ্যে গুলিয়ে যাচ্ছিলো। ঘটনার আজগুবিতাটাকে প্রশ্রয় দিতে মন চাইছিলো না, আবার কৌতুহল নিবৃত
করাটাও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো…
***
পরদিন অবিশ্রান্ত বর্ষার মধ্যেই আমার সাইকেলটা নিয়ে হাজির হলাম
ঘড়িঘরে। ঐ সময় লোকজন বিশেষ
ছিলো না। সন্তোষ আমার বন্ধু। তাই ওর সাথে ক্লক টাওয়ারের ভিতরে যাবার প্রস্তাব দিতেই রাজী হয়ে
গেলো। টাওয়ারের নীচে ভারী
তালা লাগানো একটা দরজা। সেটা খুলে ভিতরের
বিজলী বাতিটা সুইচ টিপে জ্বালিয়ে সেই টিমটিমে বাল্বের আলোয় স্টিলের সিঁড়ি বেয়ে আমরা
উঠে গেলাম উপরে। ঘড়িটার যান্ত্রিক
মস্তিষ্কটা এখন স্পষ্ট দৃশ্যমান। পেল্লাই গিয়ার, লিভার আর পেন্ডুলামের এক যান্ত্রিক জঙ্গল। এক জায়গায় দেখলাম একটা হ্যান্ডল লাগানো – সেই গাড়ি স্টার্ট করার দ-আকৃতির হাতল। সেটা ধরে ঘোরালেই চার মুখে চারটি ঘড়ির স্প্রিং দম খেয়ে জোগান দেবে
ঘড়ি চারটে চালু রাখার এক সপ্তাহের শক্তি…
সাহেবরা কি জিনিস বানিয়েছিল দেখেছো – বলল সন্তোষ। মাঝেমধ্যে তেল আর গ্রিজ দেওয়া ছাড়া কিচ্ছু করতে হয় না। এই যাঃ, তুমি একটু দাঁড়াও। ঐ হ্যান্ডলটার মধ্যে একটা রড ঢুকিয়ে ঘোরালে পরিশ্রম কম হয়ে – আমি ওটা নীচে ফেলে
এসেছি। আমি এখুনি আসছি…
আমায় একা রেখে তর তর করে নীচে নেমে গেল
সন্তোষ। আমি দেখতে পেলাম ঐ
দম-দেওয়ার হ্যান্ডলের
পাশেই একটা ছোট মত লোহার খোপ। ঠিক যেমন বইটার নক্সাতে ছিলো। উত্তেজনায় ভিতরের টিক-টক শব্দ ছাপিয়ে আমি আমার বুকের লাব-ডাব শুনতে পাচ্ছিলাম। কাঁপা হাতে আমি ঐ লৌহ-খোপের ছিটকিনি খুলতেই দেখতে পেলাম একটা চাবি। বাচ্চাদের খেলনা মোটোরগাড়ি বা পুতুল চালনা করার জন্য যেরকম চাবি
থাকে, অনেকটা সেরকম। তবে এটা সাইজে আমার
পাঞ্জার দ্বিগুণ। আধো আলোয় দেখতে পেলাম
পিছনে একটা ফুটো – যেখানে ঐ চাবিটা ঢুকবে। চাবি ঢুকিয়ে অ্যান্টি ক্লকওয়াইজ ঘোরানোর কথা লেখা ছিল। চেষ্টা করবো নাকি? আমার তিন বছর আগের অতীত রি-ভিজিট করার এর থেকে
বড়ো সুযোগ আমি পাবো না…
শুনতে পেলাম সন্তোষের গলা – তপুদা আমি রড টা কোথায়
রেখেছি বলোতো? এনেছিলাম তো? আমার হাতে ওটা দেখেছিলে…
জানিনা রে। মনে পড়ছে না। আর একটু দ্যাখ। বাইরেটা দ্যাখ – হয়তো বাইরে রেখেছিস মনের ভুলে।
এটাও কী কাকতালীয়? সন্তোষের নীচে রড
ফেলে আসা। তারপর সেটা চট করে
খুঁজে না পাওয়া। এ যেন উপরের অ্যান্টেরুমে
আমাকে একলা থাকার সুযোগ করে দেওয়ার এক অভিনব ষড়যন্ত্র… মাথা ঝিম ঝিম করছে আমার… প্রতি মুহূর্তে চারটে
ঘড়ির সিঙ্ক্রোনাইজড টিক-টক যেন আমার ঘিলুটা নিয়ে শাটল-কক খেলছে… আমাকে আমার অতীত দেখার… আমার অতীত বদলানোর
সুযোগ করে দিচ্ছে…।
চাবিটাতে হাত দিয়েও হাত সরিয়ে ফেললাম
আমি। সংশয়, দ্বিধা, বিভ্রান্তি, বিবেকের সংঘাত – নাকি অবিশ্বাস? আমি বলতে পারবো না। তবে সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো কালের চাকা ঘোরানোর কোনো অধিকার নেই
আমার। ঘড়িটার ফিসফাস আমি
শুনতে পাচ্ছিলাম। ঘড়িটা যেন আমায় বলছে – ফিরে যাও, ফিরে যাও, ঘরে ফিরে যাও…
লোহার খুপরিটা বন্ধ করে নীচে নেমে এলাম
আমি…
***
খুব শ্রান্ত লাগছিলো। সন্তোষকে একলা রেখে সাইকেল নিয়ে ভিজতে ভিজতে বাড়ি রওনা দিলাম। হঠাৎ আমার পাশে একটা ট্যাক্সি
এসে দাঁড়ালো। পিছনের সিটে বসে লম্বা, মোটা এক বুড়ো সাহেব। মাথার অনেকটা অংশ জুড়েই টাক। মুখে পাকা গোঁফ দাড়ি। চোখে সাগরের সুনীলতা। খুব আশ্চর্য হওয়ার কথা নয়। ঐতিহ্যপূর্ণ আমার এই শহরে কলকাতা থেকে অনেকই বিদেশী টুরিস্ট আসে। কাচ নামিয়ে ইংরাজিতে জিজ্ঞাসা করলো – এই অঞ্চলে একটা খুব পুরোনো চার্চ আছে। পোনেরোশো নিরানব্বই সালে বানানো – টু বি প্রিসাইজ।
ব্যাসিলিকা অফ্ দ্য হোলি রোজারি? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
ইয়েস, দ্যাটস দ্য ওয়ান।
আমি ড্রাইভারকে পথ বলে দিলাম।
থ্যাঙ্কস – বললেন সাহেব।
ধন্যবাদ জানিয়ে আমায় লজ্জা দেবেন না। আপনি আমাদের অতিথি। আপনাকে সাহায্য করা আমাদের পরম ধর্ম।
আমি চার্চের পথ বলে দেওয়ার জন্য তোমায়
থ্যাঙ্কস জানাইনি। আমি তোমার বিচক্ষণতার
জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তুমি বুদ্ধি
দেখিয়েছ ইয়াং ম্যান, বলল বুড়ো।
মানে? সাহেবের কথা ঠিক বুঝতে পেরে শুধোলাম
আমি। বুড়ো সাহেব হেসে বললেন,
সত্যিকারের জাদু অতীতকে পরিবর্তন
করার মধ্যে নয়। সত্যিকারের ম্যাজিক
হলো বর্তমানকে আলিঙ্গন করা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একটি উপহার। জীবনের সৌন্দর্য তার অনির্দেশ্যতার মধ্যেই লুকিয়ে… তুমি সুযোগ পেয়েও
সময়ের এই সত্যকে অগ্রাহ্য করোনি। ব্র্যাভো ইয়াং ম্যান।
গাড়ির
কাচ উঠিয়ে ট্যাক্সি ছুটিয়ে দিলেন সাহেব…
***
পরদিন
সরস্বতী গ্রন্থালয়ে ফের এনসাইক্লোপিডিয়া নিয়ে পড়লাম। আমাদের ঘড়িঘরের ইতিহাসটা ভালো করে পড়বো, তাই। এবং তার পরবর্তী এক ঘন্টায় আমি যা আবিষ্কার করলাম তাতে আমার হাত
পা ঠান্ডা হয়ে গেলো… রানি ভিক্টোরিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র অ্যালবার্ট এডওয়ার্ড ওরফে কিং
এডওয়ার্ড সপ্তমকে স্মরণ করার জন্য উনিশশো চোদ্দ সালে ব্রিটিশরা চারটি ঘড়ি
সমন্বিত একটি স্টিলের তৈরি ফাঁপা ঘড়ির টাওয়ার আমাদের শহরে স্থাপনা করেছিল।
ঠিক, ঠিক, সব ঠিক। ঐ কারণেই আমাদের ঘড়িঘরের ঘড়িটা লোকে এডওয়ার্ডিয়ান ঘড়ি বলেও জানে…। আর কিং এডওয়ার্ড সপ্তমের ডাকনাম ছিল বার্টি। বার্টি এডওয়ার্ড…!
বইয়ের পিছনের মলাটের ভিতর লেখকের একটা
সাদা-কালো ছবি। পুরানো হলেও বেশ বোঝা যায় এই বুড়োটার সাথেই গতকাল আমার মোলাকাত হয়েছিলো…
৮ জানুয়ারি ২০২৪,
কলকাতা
Comments
Post a Comment